Home ইসলাম মোনাজাতের দোয়া আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও নিয়ত

মোনাজাতের দোয়া আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও নিয়ত

0
মোনাজাতের দোয়া আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও নিয়ত

দোয়া আরবি শব্দ। যার অর্থ হলো আহ্বান, ডাকা, প্রার্থনা, তলব করা ইত্যাদি। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “দোয়া ইবাদতের সারাংশ।” মুমিনরা তাদের মনের সব চাওয়া-পাওয়া মোনাজাতের দোয়ার মাধ্যমে প্রভূর নিকট তুলে ধরে। তাই আজকের আর্টিকেলে আমি মোনাজাতের দোয়া আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও নিয়ত, দোয়া কবুলের আমল ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। তাহলে আর দেরি না চলুন এসব সম্পর্কে জেনে নেই।

মোনাজাতের দোয়া আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও নিয়ত
মোনাজাতের দোয়া আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও নিয়ত

মোনাজাতের দোয়া আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও নিয়ত ও দোয়া কবুলের আমল

অনেকেই মনে করে, দোয়া মানেই হলো ওযু করে, নামাজ পড়ে, দু-হাত তুলে মোনাজাতে চাওয়া। এরকম কথার কোন ভিত্তি নেই। তবে দুই হাত তুলে মোনাজাতে দোআ করা উত্তম। আপনি যেকোনো কাজে, যেকোনো সময় উঠতে, বসতে, শুইতে, কোথাও যেতে ইত্যাদি সময়ে দুয়া করতে পারেন। চলুন তাহলে তেমন কিছু দোয়া সম্পর্কে জেনে নেই –

নামাজের মোনাজাতের দোয়া আরবি ও অর্থসহ বাংলা উচ্চারণ

আজকের আর্টিকেলে আমি এমন কিছু দোয়া উল্লেখ করব, যেগুলো হাত তুলে বা না তুলে বা যেকোনো মোনাজাতের সময়, যেকোনো নামাজের (ফরয, সুন্নত, নফল) সিজদাতে, নামাজের শেষে ইত্যাদি সময়ে পড়া যাবে। এগুলো নামাজের ভিতরে আরবীতে পড়তে হবে আর বাইরে যেকোনো ভাষাতেই পড়তে পারবেন।

সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মোনাজাতের দোয়া বাংলা উচ্চারণ

رَبَّنَآ اٰتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الْاٰخِرَةِ حَسَـنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ

বাংলা উচ্চারণঃ “রব্বানা আ-তিনা ফিদ্দুনিয়া হা’সানাতাওঁ-ওয়াফিল আ-খিরাতি হা’সানাতাওঁ ওয়া-ক্বিনা আ’যাবান্নার।”

বাংলা অর্থঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়ার জীবনে কল্যাণ দান করো এবং পরকালের জীবনেও কল্যাণ দান করো। আর তুমি আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে বাঁচাও।”

মোনাজাতের দো’আ

আরবি উচ্চারণঃ “রাব্বানা জবালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়া তারা হামনা লানা কুনান্না মিলাল খাসিরিন।”

অর্থঃ “হে প্রভু! আমাদের নাসাফের উপর অত্যাচার করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা  না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া  না  করেন। তবে অবশ্যই আমাদের কষ্ট হবে।”

নামাজের মোনাজাত বাংলা উচ্চারণ – সহ মোনাজাত ও দোয়াসমূহ

কম কথায় সবচেয়ে বেশি কল্যান লাভ করার দোয়া

নিম্নের এই দোয়াটি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বেশি বেশি পাঠ করতেন।

“নবী (সাঃ) এর অধিকাংশ দুয়া ছিলোঃ

رَبَّنَآ اٰتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الْاٰخِرَةِ حَسَـنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ

আরবি উচ্চারণঃ “রব্বানা আ-তিনা ফিদ্দুনিয়া হা’সানাতাওঁ-ওয়াফিল আ-খিরাতি হা’সানাতাওঁ ওয়া-ক্বিনা আ’যাবান্নার।”

অর্থঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়ার জীবনে কল্যাণ দান করো এবং পরকালের জীবনেও কল্যাণ দান করো। আর তুমি আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে বাঁচাও।” (সুরা বাকারা – আয়াত নং – ২০১)

পাপ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার / লাভের জন্য দোয়া

আমাদের আদি পিতা হচ্ছে আদম (আঃ) এবং মা হাওয়া (আঃ)। তারা যখন আল্লাহর নিষেধ অমান্য করে, তখন স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে নিম্নের দোয়াটি শিখিয়ে দেন। আর এই দোয়ার মাধ্যমে ক্ষমা চায়লে আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। আমাদেরও উচিত পাপ থেকে ক্ষমা চাওয়ার জন্য নিয়মিত এই দোআ পড়া। দোয়াটি হলো –

رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ

বাংলা উচ্চারণঃ “রাব্বানা যলামনা আং-ফুসানা ওয়া-ইল্লাম তাগ-ফিরলানা ওয়াতার হা’মনা লানা কুনান্না মিনাল খসিরিন।”

বাংলা অর্থঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছি। অতএব তুমি যদি আমদেরকে ক্ষমা না করো এবং আমাদের প্রতি দয়া না করো, তাহলে নিশ্চয়ই আমরা ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত হব।” (সুরা আল-আ’রাফঃ আয়াত নং- ২৩)

গুনাহ থেকে মাফ পাওয়ার জন্য ও নেককার বান্দা হিসেবে মৃত্যুর জন্য দোআ

গুনাহ থেকে মাফ পাওয়ার জন্য ও নেককার বান্দা হিসেবে মৃত্যুর জন্য নিম্নের দোআটি বেশি বেশি পাঠ করা উচিত।

رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ

বাংলা উচ্চারণঃ “রব্বানা ফাগফির লানা যুনুবানা ওয়া-কাফফির আ’ন্না সাইয়্যিআ-তিনা ওয়া তাওয়াফ-ফানা মাআ’ল আবরা-র।”

অর্থঃ হে আমাদের পালনর্তা! তুমি আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দাও, আমাদের মন্দ কাজগুলো দূর করে দাও আর আমাদেরকে নেককার হিসেবে মৃত্যু দান করো। (সুরা আল ইমরান – আয়াত নং ১৯৩)

পিতা-মাতার জন্য দুয়া (আরবি ও বাংলা উচ্চারণ)

আমাদের অত্যন্ত আপনজন হলো পিতা-মাতা। তারা অনেক কষ্ট করে আমাদের লালন-পালন করেছেন। আমাদের উচিত তাদের জন্য বেশি বেশি দোআ করা। জীবিত বা মৃত পিতা-মাতা উভয়ের জন্য এই দুয়া বেশি করতে হবেঃ

رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا

আরবি উচ্চারণঃ রব্বির হা’ম-হুমা কামা রব্বা ইয়ানি সগিরা।

অর্থঃ হে আমাদের পালনর্তা! তুমি আমার পিতা-মাতার প্রতি তেমনি দয়া করো, যেইরকম দয়া তারা আমাকে শিশু অবস্থায় করেছিল। (সূরা বনী-ইসরাঈলঃ আয়াত নং – ২৪)

ছোট কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দোয়া

কারো ভালো করাই মানে এই না যে, আল্লাহ তাকে অনেক টাকা পয়সা, ভালো স্বামী বা স্ত্রী, দামী গাড়ি দিবেন, এমন না। কিন্তু আমরা এগুলোকেই কল্যাণকর মনে করি। এসব পার্থিব বিষয় কখনো আল্লাহ তা’আলার নিয়ামত হতে পারে না। কখনো কখনো এগুলো আল্লাহর পরীক্ষা হতে পারে। মহান আল্লাহ তা’আলা যখন কারো কল্যাণ চান, তখন তাকে ফিকহ্ বা দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন। আর এসব জ্ঞান চাওয়ার জন্য রাসূল (সাঃ) ছোট ছোট অনেক দুআ শিখিয়ে দিয়েছেন। আপনারা এসব ছোট ছোট দুআ মুখস্থ করে নিয়ে বেশি বেশি পাঠ করতে পারেন। তেমনি একটি দোয়া হলো –

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْماً نَافِعاً، وَرِزْقاً طَيِّباً، وَعَمَلاً مُتَقَبَّلاً

বাংলা উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আস-আলুকা ই’লমান নাফিআ’, ওয়া রিযক্বান ত্বইয়্যিবা, ওয়া আ’মালাম-মুতাক্বব্বালা।

অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট উপকারী জ্ঞান, পবিত্র জীবিকা ও কবুল করা হয় এমন আমল প্রার্থনা করছি। (ইবনে মাজাহ)

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া। এর মাধ্যমে দুটি জিনিস চাওয়া হয়েছে।

  • রিযকান ত্বাইয়্যিবান বা পবিত্র জীবিকা।
  • আ’মালান মুতাক্বাব্বালান বা এমন আমল যা আল্লাহর কাছে কবুল হয়, পরকালের জন্য যা প্রয়োজন।

প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর এ দুআটি একবার করে পড়া সুন্নাত। তাছাড়া সিজদাহ্ ও সালাম ফেরানোর পূর্বেও এটি পাঠ করা যাবে। যতদিন না মুখস্থ হয়, ততদিন আরবিতে না পারলেও বাংলায় পড়া যাবে।

হেদায়েতের উপর অটল থাকা এবং অন্তর যেন দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে তার জন্য দুয়া

হৃদয়কে আরবিতে ক্বালব বলা হয়। এর অর্থ হলো – যে জিনিস খুব তাড়াতাড়ি পরিবর্তন হয়ে যায়। এর মূল কথা হলো – মানুষের ক্বালব দ্রুত পরিবর্তন হয়। এজন্য মানুষ আজ যাকে ভালবাসে, কাল তাকে শত্রু ভাবে। কিয়ামতের আগে দেখা যাবে যে মানুষ সকালে ঈমানদার থাকবে আর রাতে কাফের হয়ে যাবে৷ তাই ক্বালব যাতে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, কুফুরি, পাপাচারে লিপ্ত না হয়, সেজন্য রাসূল (সাঃ) নিম্নোক্ত দুয়াটি বারবার পড়তেন৷ দুয়াটি হলো –

يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ

উচ্চারণঃ “ইয়া মুক্বাল্লিবাল ক্বুলুব! সাব্বিত ক্বালবী আ’লা দ্বীনিক।”

বাংলা অর্থঃ “হে হৃদয় সমূহ পরিবর্তন করার মালিক! আমার হৃদয়কে তোমার দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখো।” (সুনানে তিরমিযী)

তাছাড়া কুরআনে বর্ণিত নিম্নের দুয়া পড়া যেতে পারেঃ-

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ

বাংলা উচ্চারণঃ “রব্বানা লা তুযিগ ক্বুলুবানা বাঅ’দা ইয হাদাইতানা ওয়াহাব লানা মিল্লাদুনকা রাহ’মাহ, ইন্নাকা আংতাল ওহহাব।”

অর্থঃ “হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে হেদায়েত করার পর তুমি আমাদের অন্তরকে বাঁকা করে দিয়োনা এবং তোমার নিকট থেকে আমাদেরকে রহমত দান করো। নিশ্চয়ই তুমি অত্যন্ত দয়ালু।” (সুরা আলে ইমরান – আয়াত নং – ৮)

“অন্তরকে বাঁকা অর্থ হচ্ছে অন্তরে মুনাফেকী, কুফুরী, পাপাচার বা আল্লাহর অবাধ্যতা প্রবেশ করা।”

রাসূল (সাঃ) এর সুন্দর একটি দো’আ

এই দুআটি মুখস্ত করে নিতে পারেন এবং মুনাজাতের সময় বেশি বেশি করে, বিশেষ করে সিজদাতে এই দোয়াটি করতে পারেন।

اَللهم إِنِّي أَسْأَلُكَ الهُدَى، وَالتُّقَى، وَالعَفَافَ، وَالغِنَى

আরবি উচ্চারণঃ “আল্লা-হুম্মা ইন্নি আস-আলুকাল হুদা ওয়াত-তুক্বা ওয়াল আ’ফাফা ওয়াল গিনা।”

অর্থঃ “হে আল্লাহ আমি তোমার কাছে হেদায়েত, তাক্বওয়া, সুস্থতা ও সম্পদ প্রার্থনা করছি।” (সহীহ মুসলিমঃ হাদিস নং – ২৭২১, তিরমিযীঃ হাদিস নং -৩৪৮৯)

ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত যেকোনো শিরক থেকে বাঁচার দোয়া

ধরুন, কোন ঈমানদার ব্যক্তি ত্রিশ বছর ধরে মহান আল্লাহ তা’আলার ইবাদত করল কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে শিরক করে তওবা না করেই মারা গেলে, শিরকের জন্য তার সব আমল নষ্ট হয়ে যাবে। কিয়ামতের দিন তার এসব আমল কোন কাজে আসবে না। আল্লাহ তা’আলা হেফাজত না করলে, জেনে হোক বা না জোনে হোক মানুষ শিরকে লিপ্ত হতে পারে। তাই শিরক থেকে সবসময় আল্লাহ তা’আলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত। মহানবী (সাঃ) এর শেখানো একটি দুয়া আছে। কেউ যদি প্রত্যেক দিন সকাল – বিকালে অন্তত একবার বা তিনবার করে এই দুয়াটি পড়ে, তাহলে আশা করা যায় যে, মহান আল্লাহ তা’আলা তাকে শিরক থেকে হেফাজত করবেন৷ দুআটি হলো –

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لاَ أَعْلَمُ

বাংলা উচ্চারণঃ “আল্লা-হুম্মা ইন্নী আ’উযুবিকা আন উশরিকা বিকা ওয়া আনা আ’লাম, ওয়া আস-তাগফিরুকা লিমা লা আ’লাম।”

অনুবাদঃ “হে আল্লাহ! আমার জানা অবস্থায় তোমার সাথে শিরক করা থেকে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আর আমার অজানা অবস্থায় কোনো শিরক হয়ে গেলে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি।” (আহমাদঃ ৪/৪০৩)

যেকোন বিপদ-আপদ বা দুঃশ্চিন্তা থেকে মুক্তির জন্য দোয়া ইউনুস

সমুদ্রের গভীর পানির নীচে, তিমি মাছের পেটে অন্ধকারে ডুবে থাকা অবস্থায় ইউনুস (আঃ) এই দোয়া করেছিলেন এবং কঠিন বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন।

لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظّالِمِينَ

আরবি উচ্চারণঃ “লা ইলা-হা ইল্লা আংতা, সুবহা’-নাকা ইন্নি কুংতু-মিনায-যলিমিন।”

অর্থঃ “(হে আল্লাহ!) তুমি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নাই, তুমি পবিত্র ও মহান! নিশ্চয় আমি জালেমদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত নং – ৮৭)

দোয়া ইউনুসের উপকারীতাঃ একটি হাদিসে উল্লেখ আছে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি এই (দুয়া ইউনুস) পড়ে, তাহলে তার দোয়া কবুল করা হবে।” অন্য আরেকটি হাদীস অনুযায়ী, “এই দুয়া পড়লে আল্লাহ তার দুঃশ্চিন্তা দূর করে দিবেন।” (সুনানে আত-তিরমিযী)

দুআ যেভাবে পড়তে হবেঃ বিপদ-আপদ বা দুঃশ্চিন্তার সময় এই দোয়াটি বেশি বেশি করে পড়তে হয়। আপনার যতবার ইচ্ছা ও যতবার সম্ভব হয় ততবার পড়বেন। এক লক্ষ পঁচিশ হাজার পড়ে যে “খতম ইউনুস” পড়ানো হয় হুজুর বা মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে টাকা দিয়ে ভাড়া করে, বা দুয়া কেনাবেচা করা হয়, এইগুলো তাদের দিয়ে করানো বিদআ’ত। এরকম খতমে ইউনুস পড়ানোর কোনো দলীল নেই। দোয়া ইউনুস যতবার সম্ভব হয় ততবার পড়বেন, এত বার পড়তে হবে এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। নিজের জন্য নিজে দোয়া করবেন, সেটাই মহান আল্লাহর কাছে বেশি পছন্দনীয়।

আল্লাহর যিকর, শুকিরিয়া ও সুন্দরভাবে তাঁর ইবাদত করার জন্য সাহায্য চাওয়ার দোয়া

اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ، وَشُكْرِكَ، وَحُسْنِ عِبادَتِكَ

বাংলা উচ্চারণঃ “আল্লাহুম্মা আ ই’ন্নী আ’লা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হু’সনি ইবাদাতিক।”

অর্থঃ “হে আল্লাহ! তুমি আমাকে তোমার স্মরণ, তোমার কৃতজ্ঞতা এবং তোমার সুন্দর ইবাদত করার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য কর।”

আপনিইচ্ছা করলে এই দুআটি নামাযের ভিতরে সিজদাতে বা সালাম ফেরানোর পুর্বে দোয়া মাসূরার সময়ও করা যায়। এটি এত গুরুত্বপূর্ণ যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) একজন সাহাবীকে এই দু’আ পড়ার জন্য বিশেষভাবে ওয়াসীয়ত করে যান।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মুয়ায বিন জাবাল (রাঃ) এর হাত ধরে বলেছিলেন, “হে মুয়াজ! আল্লাহর কসম আমি তোমাকে ভালোবাসি। অতঃপর তিনি বললেন, হে মুয়াজ! আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে তুমি প্রত্যেক সালাতের শেষ এই দুয়াটি করা ত্যাগ করবেনা, “আল্লাহুম্মা আ ই’ন্নী আ’লা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হু’সনি ইবাদাতিকা।” (আবু দাউদঃ হাদিস নং – ১/২১৩, নাসায়ী, ইবেন হিব্বান, হাদীস সহীহ)

নেককার স্বামী/স্ত্রী ও সন্তানের জন্য দোয়া

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

আরবি উচ্চারণঃ “রব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা ক্বুররাতা আ’ইয়ুন, ওয়াজআ’লনা লিল মুত্তাক্বীনা ইমামা।”

অর্থঃ “হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে চোখের শীতলতা দান করো এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য ইমাম (আদর্শ স্বরূপ) বানাও।” (সূরা আল-ফুরক্বানঃ আয়াত নং – ৭৪)

সমস্ত মুসলিমদের মাগফিরাতের জন্য দু’আ

নিজের জন্য, পিতা-মাতার জন্য এবং সমস্ত মুসলিম উম্মতদের ক্ষমা প্রার্থনার জন্য ছোট ও সুন্দর কুরআনী নিচের এই দুয়াটি মুখস্থ করে নিতে পারেন –

رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ

বাংলা উচ্চারণঃ “রব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা ক্বুররাতা আ’ইয়ুন, ওয়াজআ’লনা লিল মুত্তাক্বীনা ইমামা।”

বাংলা অর্থঃ “হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে চোখের শীতলতা দান করো এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য ইমাম (আদর্শ স্বরূপ) বানাও।” (সূরা আল-ফুরক্বানঃ আয়াত নং -৭৪)

সমস্ত মুসলিমদের মাগফিরাতের জন্য দুয়া

নিজের জন্য, পিতা-মাতার জন্য এবং সমস্ত মুসলিম উম্মতদের ক্ষমা প্রার্থনার জন্য ছোট ও সুন্দর কুরআনী নিচের এই দুয়াটি মুখস্থ করে নিতে পারেন –

رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ

উচ্চারণঃ “রব্বানাগ-ফিরলি ওয়ালি ওয়ালি-দাইয়্যা ওয়ালিল মু’মিনিনা ইয়াওমা ইয়াক্বুমুল হি’সাব।”

অর্থঃ “হে আমাদের পালনকর্তা! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সকল ঈমানদার লোকদেরকে আপনি সেইদিন ক্ষমা করে দিও, যেইদিন হিসাব কায়েম করা হবে।” (সূরা ইব্রাহিমঃ আয়াত নং – ৪১)

ওযুর পরে তৃতীয় পূর্ণাঙ্গ একটি দুআ

اللهم اغفر لي ذنبي ووسع لي في داري وبارك لي في رزقي

আরবি উচ্চারণঃ “আল্লাহুম্মাগফিরলী যামবী ওয়া ওয়াসসি’ ফি- দা-রী ওয়া বারিকলী ফি- রিযক্বী।”

বাংলা অর্থঃ “হে আল্লাহ তুমি আমার গুনাহ সমূহ মাফ করে দাও, আমার ঘর-বাড়ীতে প্রশস্ততা দান করো এবং আমার রিযক্বে বরকত দান করো।”

এই দুয়াটি আপনারা যেকোন মুনাজাত বা দুয়াতেও পড়তে পারবেন।

ইলম / জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য দুয়া

رَّبِّ زِدۡنِي عِلۡمٗا

উচ্চারণঃ “রাব্বি যিদনী ঈ’লমা।”

অর্থঃ “হে আমার পালনকর্তা! তুমি আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করো।” (সূরা ত্বোয়াঃ আয়াত নং – ১১৪)

স্মৃতি শক্তি বাড়ানো, বুদ্ধির প্রখরতা বৃদ্ধি করা, জিহবার জড়তা বা তোতলামি দূর করার জন্য ও দাওয়াতী কাজে সাহায্য লাভের জন্য দোয়া

رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي

وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي

وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي

يَفْقَهُوا قَوْلِي

উচ্চারণঃ “রাব্বিশ-রহ’লী সদরী। ওয়া ইয়াসসিরলী আমরী। ওয়াহ’লুল উ’ক্বদাতাম-মিল্লিসানি। ইয়াফক্বাহু ক্বওলী।”

অর্থঃ “হে আমার পালনকর্তা! আমার বক্ষকে প্রশস্ত করে দাও। আমার কাজ সহজ করে দাও। আর আমার জিহবা থেকে জড়তা দূর করে দাও, যাতে করে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।” (সুরা ত্বোয়া হাঃ আয়াত নং – ২৫-২৮)

দ্বীনের জ্ঞান চাওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো সুন্দর ছোট একটা দুয়া

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْماً نَافِعاً، وَرِزْقاً طَيِّباً، وَعَمَلاً مُتَقَبَّلاً

বাংলা উচ্চারণঃ “আল্লা-হুম্মা ইন্নী আস-আলুকা ই’লমান নাফিআ’ন, ওয়া রিযক্বান ত্বাইয়্যিবান, ওয়া আ’মালাম-মুতাক্বাব্বালা।”

অর্থঃ “হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট উপকারী জ্ঞান, পবিত্র জীবিকা ও কবুল করা হয় এমন আমল প্রার্থনা করছি।” (ইবনে মাজাহ, হিসনুল মুসলিম পৃষ্ঠা ১১৩)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এই বলে দুয়া করতেন

اللَّهُمَّ انْفَعْنِي بِمَا عَلَّمْتَنِي وَعَلِّمْنِي مَا يَنْفَعُنِي وَزِدْنِي عِلْمًا

উচ্চারণঃ “আল্লাহুম্মান ফাঅ’নী বিমা আ’ল্লামতানী, ওয়া আ’ল্লিমনা মা ইয়ানফাউ’নী, ওয়া যিদনী ই’লমা।”

অর্থঃ “হে আল্লাহ তুমি আমাকে যেই ইলম দান করছো, তা দ্বারা আমাকে উপকৃত করো, আমাকে সেই ইলম দান করো, যা আমাকে উপকৃত করবে। আর আমার ইলম আরো বাড়িয়ে দাও।” (ইবনে মাজাহঃ হাদিস নং – ১/৪৭, তিরমিযীঃ হাদিস নং – ৩৫৯৯)

জীবনকে আলোকিত করার জন্য দোআ

رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

অর্থঃ “হে আমাদের রব্ব! আমাদের জন্য আমাদের নূর (আলো) পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন; নিশ্চয় আপনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।”

উচ্চারণঃ “রব্বানা আতমিম লানা-নূরানা, ওয়াগফির লানা, ইন্নাকা আ’লা-কুল্লি শাইয়িন ক্বদীর।”(সূরা আত-তাহরীমঃ আয়াত নং – ৮)

ধৈর্য লাভ এবং মুসলমান হিসেবে মৃত্যুবরণ করার জন্য দোয়া

رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَّتَوَفَّنَا مُسْلِمِيْنَ

উচ্চারণঃ “রব্বানা আফরিগ আ’লাইনা- ছবরাওঁ-ওয়াতাওয়াফ্ফানা- মুসলিমিন।”

অর্থঃ হে আমাদের রব! আমাদেরকে পরিপূর্ণ ধৈর্য দান করুন এবং আমাদেরকে মুসলিম হিসাবে মৃত্যু দান করুন। (সুরা আ’রাফঃ আয়াত নং – ১২৬)

আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য মুসা আ’লাইহিস সালামের দুয়া

رَبِّ إِنِّيْ لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيْرٌ

উচ্চারণঃ “রব্বি ইন্নী লিমা- আংঝালতা ইলাইয়্যা মিন খাইরিং ফাক্বীর।”

অর্থঃ “হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয় আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহই নাযিল করবেন, আমি তার মুখাপেক্ষী।” (সুরা আল-ক্বাসাসঃ আয়াত নং ২৪)

অলসতার কারণে বা ইমানের দুর্বলতার কারণে যারা আরবিতে মুখস্থ করতে পারেন না, তারা অন্তত বাংলাটা মুখস্থ করতে পারেন এবং বেশি বেশি এসব দুয়া পাঠ করতে পারেন।

মোনাজাত ও দোয়া করার নিয়ম

কাদের দোয়া বেশি বেশি কবুল হয়

  • নেক সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া
  • মজলুম (যিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন তাকে মজলুম বলা হয়)
  • মুসাফির (দেশ-বিদেশে যিনি সফর করে বেড়ান)

দোয়া কখন বেশি কবুল হয়?

  • তাহাজ্জুদের পরে
  • আযান ও ইকামাতের মধ্যবর্তী সময়
  • প্রতি ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর (যেমন – ফজরের ২ রাকআত ফরজ নামাজের পর)
  • বৃষ্টির সময়

কোন কোন বিষয়ে দোয়া করা যায়

পৃথিবীতে এমন কোন জিনিস নেই, যা নিয়ে মহান আল্লাহ তা’আলার নিকট চাইতে পারবেন না৷ সবকিছুই আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা যায়। বলা হয়েছে যে – যদি তোমার জুতার ফিতাও ছিড়ে যায়, সেটা নিয়েও আল্লাহর দরবারে বলতে পার। তবে বলা হয়েছে যে, দুনিয়ায় কারো কাছে হাত পাতার আগে আল্লাহ তা’আলার কাছে চাইতে হবে। অর্থাৎ কারো কাছে টাকা ধার করতে যাওয়ার পূর্বে দুই রাকআত নামাজ পড়ে আল্লাহর নিকট বলো যে, তোমার টাকা দরকার। তারপর ধার করতে যাও।

দোয়া কবুল না হওয়ার কারণসমূহ

কিছু কিছু পাপ আছে, যা আল্লাহর বান্দার মাঝে থাকলে, তার দুআ কবুল হয় না। তাই এসব পাপ থেকে নিজেকে হেফাজত করতে হবে। তাহলে তার দুআ কবুল হবে। বিশেষ করে মোনাজের দোয়া -র সময় বেশি বেশি আল্লাহর কাছে চায়তে হবে। যাতে করে এসব পাপ থেকে দূরে থাকা যায়।

দুআ কবুলের অন্তরায় সমূহ

হারাম খাদ্য, হারাম পানীয় ও হারাম বস্ত্র

হারাম খাবার খেলে বা হারাম টাকায় খাদ্য কেনা হলে, হারাম টাকায় পোশাক কেনা হলে, তার সবকিছুই হারাম হয়ে যায়। এসব হারাম জিনিস গ্রহণ করা অবস্থায় আপনি যতই আল্লাহ তা’আলার ইবাদত করেন না কেন, তার কোন কিছুই আপনার কাজে আসবে না। এ অবস্থায় আল্লাহর নিকট কোন দোআ করলেও আল্লাহ তা কবুল করেন না।

হাদিসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন – “হে মানব সকল! আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া কোনো কিছু গ্রহণ করেন না।”

তিনি বলেছেন –

“হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার কর ও সৎকর্ম কর, তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবহিত।”

এবং আল্লাহ (মুমিনদেরকে উদ্দেশ্য) করে বলেছেনঃ

“হে মুমিনগণ! তোমাদের আমি যেসব পবিত্র বস্তু দিয়েছি তা হতে আহার কর।”

এ কথা বলার পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এমন এক ব্যক্তির কথা বললেন, যে দীর্ঘ সফর করে মাথার চুলগুলোকে এলোমেলো করেছে এবং পদযুগল ধুলায় ধুসরিত করেছে অতঃপর আকাশের দিকে হাত তুলে দুআ করে, হে প্রভু! হে প্রভু! কিন্তু তার খাদ্য হারাম, তার পোশাক হারাম, তার শরীর গঠিত হয়েছে হারাম দিয়ে, কিভাবে তার দুআ কবুল করা হবে?”(সহীহ মুসলিম)

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ বর্জন করা

একজন মুমিন মুসলিম হিসেবে, আমাদের দায়িত্ব হলো সৎ কাজে আদেশ দান করা আর অসৎ কাজ বা খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা। এসব না করলে আল্লাহ তা’আলা তার দুআ কবুল করেন না।

নবী কারীম (সাঃ) বলেছেন,

“তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের প্রতি শাস্তি নাযিল করবেন অতঃপর তোমরা দুআ করবে কিন্তু তিনি তা কবুল করবেন না।” (তিরমিজী)

দুআ কবুলে তাড়াহুড়ো করা

অনেকে আল্লাহর নিকট কোন কিছুর প্রার্থনা করে, কিছুদিন পর তা না পেলে হতাশ হয়ে পড়ে। অর্থাৎ দোয়া কবুলে তাড়াহুড়ো করে। অনেকে আবার অভিযোগ করা শুরু করে যে, দোয়া করলাম , আল্লাহ তা’আলা কবুল করেন না। তিনি মনে হয় আমাদের প্রার্থনা শুনেন না। ইত্যাদি। এসব বলার শাস্তি হিসেবে মহান আল্লাহ তা’আলা সত্যিই তার দুআ কবুল করেন না। তাই কোনকিছু পেতে হলে, ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে। জাকারিয়া (আঃ) অনেক অনেক বছর দুআ করার পরে তাঁর দুয়া কবুল হয়েছিলো। তিনি পুত্র সন্তান পেয়েছিলেন একেবারে বৃদ্ধ বয়সে। তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী, আর আমরা নিশ্চয়ই তাঁর থেকে উত্তম না (নাউযুবিল্লাহ)।

তাই সর্বাবস্থায় ধৈর্য্য ধরতে হবে। আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হবে। নবী (সাঃ) বলেছেন, “বান্দার দুআ সর্বদা কবুল করা হয় যদি সে দুআতে পাপ অথবা আত্মীয়তার সম্পর্কের ছিন্ন করার কথা না বলে এবং তাড়াহুড়ো না করে। জিজ্ঞেস করা হল হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াহুড়ো বলতে কি বুঝায়? তিনি বললেন, দুআতে তাড়াহুড়া হল, প্রার্থনাকারী বলে আমিতো দুআ করলাম কিন্তু কবুল হতে দেখলাম না। ফলে সে নিরাশ হয় ও ক্লান্ত হয়ে দুআ করা ছেড়ে দেয়।” (সহীহ মুসলিম)

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “আর মানুষ অকল্যাণের দুআ করে, যেভাবে সে কল্যাণের দুআ করে, তবে মানুষ তো অতিমাত্রায় ত্বরা প্রিয়।” (আল ইসরাঃ আয়াত নং – ১১)

দোয়া কিভাবে করতে হয়?

রাসুল (সাঃ) বলেন – উদাসীন হৃদয়ের দোয়া কবুল হয়না। তাই দোয়া করতে হবে একাগ্রচিত্তে, ধ্যান-মন এক সাথে করে। আল্লাহর কাছে নতজানু হতে হবে। নিজেকে আল্লাহর কাছে পূর্ণাংগ ভাবে সমর্পণ করতে হবে।

দোয়া শুরুর আগে কয়েক বার দুরুদ শরীফ পরতে হবে। তারপর পশ্চিম দিকে ফিরে নামাজের সুরতে বসে দোয়া শুরু করতে হবে। দোয়া শেষ হবার পর আরো কয়েকবার দুরুদ শরীফ পড়ে নবী (সাঃ) এর দরবারে বকশিশ দিতে হবে। একদিন দোয়া করলেই আল্লাহ সব দিয়ে দিবেনা। বার বার চাইতে হবে। কান্না করতে হবে। মনে কর- তোমার কাছে দুইটা ভিখারী আসল। একজন কান্না করতেছে আর একজন শুধু দাঁড়িয়ে আছে। তোমার কাছে শুধু মাত্র পাচ টাকার একটা নোট আছে। তুমি কাকে দিবে? নিশ্চয় যে কান্না করছে তাকে দিবে। তেমনি ভাবে আল্লাহর কাছে না কাদলে তুমি কিছুই পাবেনা। আল্লাহর কাছে অনেকে অনেক কিছুই চায়, কিন্ত আল্লাহ সবাইকে দেয়না। যে কাদে তাকেই দেয় । শেষ রাতে দোয়া কবুল হওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এ সময় আল্লাহ সপ্তম আসমান থেকে নেমে এসে চতুর্থ আসমানে আসেন। দুনিয়ার লোকদের কাছে উদ্দেশ্য করে বলেন – তোমাদের কার কি দরকার আমাকে বল। আমি এখন দেব। আমি যদি দুনিয়ার প্রত্যেকে এইর রকম সাতটা দুনিয়ার সমান সম্পদ দান করি, তবুও আমার রহমতের দরিয়া থেকে দানা পরিমাণ কম পড়বে না। এরপর ফজর শুরুর আগে আবার সপ্তম আসমানে চলে যান।

১৫টি সহজ মুনাজাত বাংলা উচ্চারণ

১) রাব্বানা আতিনা ফিদ্ দুনইয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আযাবাননার (সূরা আল বাকারা,আয়াত নং – ২০১)

২) রাব্বানা যালামনা আংফুসানা ওয়া ইললাম তাগফিরলানা ওয়া তারহামনা লানা কূনান্না মিনাল খাসিরীন।(সূরা আল আরাফ,আয়াত নং – ২৩)

৩) রাব্বানা লা তুযিগ কুলূবানা বা’দা ইযহাদাইতানা ওয়া হাবলানা মিল্লাদুংকা রাহমাতান ইন্নাকা আংতাল ওয়াহহাব। (সুরা আল-ইমরান,আয়াত নং – ০৮)

৪) রাব্বানাগ ফিরলানা যুনূবানা ওয়া ইসরা’ফানা ফী আমরিনা ওয়া সাব্বিত আক্বদা মানা ওয়ানসুরনা আলাল ক্বাওমিল কাফিরীন।(সূরা আল ইমরান,আয়াত নং – ১৪৭)

৫) রাব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিইয়াতিনা কুররাতা আ’ইনিও ওয়াজ আলনা লিল মুত্তাকিনা ইমামা।(সূরা ফুরকান,আয়াত নং – ৭৪)

৬) রাব্বানা আফরিগ্ আলাইনা ছাবরাও ওয়া সাব্বিত আক্বদা মানা ওয়ানসুরনা আলাল ক্বাওমিল কাফিরীন।
(সুরা আল বাকারা,আয়াত নং – ২৫০)

৭) রাব্বিজ আলনী মুকীমাছছালাতি ওয়ামিন যুররিইয়াতী রাব্বানা ওয়া তাকাব্বাল দু’আ-ই।(সূরা ইবরাহীম,আয়াত নং – ৪০)

৮) রাব্বানাগ্ ফিরলী ওয়ালি ওয়ালি দাইয়া ওয়ালিল মু’মিনীনা ইয়াওমা ইয়াক্বুমুল হিসাব।( সুরা ইবরাহিম,আয়াত নং – ৪১)

৯) রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাআনী ছাগিরাহ।(সূরা বনী ইসরাঈল,আয়াত নং – ২৪)

১০) রাব্বি যিদনী ইলমা।(সূরা ত্বহা,আয়াত নং – ১১৪)

১১) রাব্বিশ রাহলী ছদরী,ওয়া ইয়াসসিরলী আমরী, ওয়াহলুল উক্বদাতাম মিল লিসানী, ইয়াফক্বাহু ক্বওলী।(সূরাঃত্বহা,আয়াত নং – ২৫-২৮)

১২) রাব্বানা তাকাব্বাল মিন্না ইন্নাকা আনতাস সামীউল আলীম।( সূরা আল বাকারা,আয়াত নং – ১২৭)

১৩) রাব্বানা ফাগফিরলানা যুনূবানা ওয়া কাফফির আন্না সাইয়ি আতিনা ওয়া তাওয়াফফানা মা’আল আবরার। ( সুরাঃ আল ইমরান,আয়াত নং – ১৯৩)

১৪) রাব্বানা ওয়াজ আলনা মুসলিমাইনি লাকা ওয়ামিন যুররিইয়াতিনা উম্মাতাম মুসলিমাতাল লাকা ওয়া আরিনা মানা সিকানা ওয়াতুব আলাইনা ইন্নাকা আন্তাত তাওয়াবুর রাহীম।(সুরা বাকারা,আয়াত নং – ১২৮)

১৫) রাব্বানা ইন্নাকা রাউফুর রাহীম। (সুরা হাশর,আয়াত নং – ১০)

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এগুলো পড়ার আগে পরে দরূদ পড়ে নিবেন।

দোয়া কবুলের আমল

মানুষ আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘আশরাফুল মাখলুকাত‘। মানুষ হিসেবে আমরা খুবই দুর্বল। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের সাহায্য ছাড়া আমাদের কিছু করার ক্ষমতা নেই। আমাদের সকল সুখ-দুঃখ ও বিপদ-আপদে মহান প্রভুর দরবারে আন্তরিক প্রার্থনায় নিয়োজিত থাকতে হবে। এই দুশ্চিন্তাকে আমরা অ্যানেস্থেশিয়া-ছাবতা দোয়া বলি।

মহান গ্রন্থ আল-কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যখন আমার বান্দা তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে; আমি কাছে আছি যখন সে আমার কাছে প্রার্থনা করে তখন আমি প্রার্থনা কবুল করি। ‘ (সূরা বাকারা: 18) আল্লাহ দোয়া কবুল করতে পছন্দ করেন। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করতে খুশি. এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহকে ডাকো ভয় ও আশা নিয়ে। নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী। (সূরা আরাফ : ৫৬)।

শুধু বান্দা চায়, আল্লাহ তার দোয়া কবুল করুক। তার ডাক শোন। দোয়া কবুলের সময় আল্লাহ কোন দোয়া বেশি পছন্দ করেন তার বিস্তারিত বর্ণনা হাদীস শরীফে আছে। আমরা তা থেকে কিছু আলোচনা করার চেষ্টা করব।

যে দোয়া আল্লাহ খুব দ্রুত কবুল করেন, তা বেশি কবুল হয়: বান্দা সিজদা অবস্থায় তার রবের সবচেয়ে কাছে থাকে। তাই বেশি বেশি নামায পড় (সে অবস্থায়)। (মুসলিম: 482, নাসাঈ: 1138, আবু দাউদ: 65, আহমদ: 9175)।

যে ব্যক্তি রাতে জেগে বলে: লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ-হু ওয়াহদাহ লা-শারিকালাহু, লাহুল মুলকু, ওয়ালাহুল হামদু, ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইন কাদির। সুবহানাল্লাহি, ওয়ালহামদু লিল্লাহি, ওয়া লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ-হু, ওয়ালা-হু আকবার। ওয়া লা-হাওলা ওয়ালা-ক্বওয়াতা ইল্লা-বিল্লা-হিল আলিয়িল আজিম। ‘তাকে ক্ষমা করা হবে। সে দোয়া করলে তার দোয়া কবুল হবে। সে উঠে অযু করলে তার নামায কবুল হবে। (বুখারী: ফাতহুল বারী: 1154. সহীহ ইবনে মাজাহ: 2/335)।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘কোন দোয়াটি সবচেয়ে বেশি শোনা (কবুল করা হয়)?’ তিনি বললেন, ‘রাত্রির শেষ দিকে এবং ফরয সালাতের শেষে।‘ এবং আল্লাহ আরো বলেন, ‘প্রতি রাতে যখন রাতের এক তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, আমাদের প্রতিপালক পৃথিবীর কাছে আকাশে অবতরণ করেন।তারপর বললেন, আমার কাছে কে দোয়া করবে আমি কবুল করব? আমার যা প্রয়োজন তা কে আমার কাছে চাইবে এবং আমি তাকে দেব? যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব। (বুখারি: 1145, মুসলিম)।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আযান ও ইকামাতের মধ্যে যে দোয়া করা হয় তা কখনো ফেরত দেওয়া হয় না।‘ (তিরমিজি: 3594, আবু দাউদ: 525; কোনো মুসলমান কোনো প্রয়োজনে দোয়া ইউনুস পাঠ করলে আল্লাহ তায়ালা কবুল করবেন। তার দো‘আ।‘ (তিরমিযী, সহীহুল জামি: 3373)। অন্য হাদিস অনুসারে, ইউনূস দো‘আ পাঠ করলে আল্লাহ তার দুশ্চিন্তা দূর করবেন।

উচ্চারণ: লা ইলা-হা ইল্লা-আন্তা, সুবহা-নাকা ইন্নি কুনতু-মিনাজ-ইওআলিমিন।

অর্থ: ‘(হে আল্লাহ) তুমি ছাড়া কোন উপাস্য নেই, তুমি পবিত্র ও মহান! নিশ্চয়ই আমি জালেমদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা আম্বিয়া : ৬)।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here